শ্রীকাইল কে.কে.এম.উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা স্বর্গীয় ক্যাপ্টেন নরেন্দ্রনাথ দত্তের ১৩৬ তম জন্ম বার্ষিকী

প্রকাশিত: 5:00 PM, September 21, 2020

মোঃজুয়েল রানা,মুরাদনগর কুমিল্লা।

শ্রীকাইল কে.কে.এম.উচ্চ বিদ্যালয় শিক্ষক -কর্মচারি, ম্যানেজিং কমিটির সম্মানীত সদস্যবৃন্দ,এলাকার বিশিষ্ট অভিভাবকবৃন্দের উপস্থিতিতে কেক কেটে জন্মদিন পালন কার্যক্রম শুরু হয়।এরপর তিনির জীবনীর উপর বক্তাগণ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।

বিদ্যালয়ের সহকারি প্রধান শিক্ষক জনাব নাছির উদ্দিন এর সভাপতিত্বে এবং সিনিয়র শিক্ষক শাহ এমরান উদ্দিনের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বক্তব্য প্রদান করেন শ্রীকাইল সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মিয়া মোহাম্মদ গোলাম সারোয়ার,বিশিষ্ট কবি -সাহিত্যক আব্দুস ছাত্তার, বিদ্যালয় সহকারি সিনিয়র শিক্ষক ছাদেকুর রহমান, মুরাদনগর প্রেস ক্লাবের সহসভাপতি জনাব এম.কে.আই জাবেদ,শ্রীকাইল ইউনিয়ন আওয়ামী যুবলীগ সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস প্রমুখ।
বাঙ্গালীর গৌরব কর্মবীর ক্যাপ্টেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত ২১শে সেপ্টেম্বর ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরা জেলার শ্রীকাইল গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন।

 

১৮৯৪ সাল যখন নরেন্দ্রনাথ দত্তের বয়স ৬/৭ বছর তখন তিনির মা ইহকাল ত্যাগ করেন।
বাবা থাকতেন বড় দুই ছেলেকে নিয়ে চট্রগাম।বাড়িতে এক পিসিমার নিকট নরেন্দ্রনাথ দত্ত ও দেবেন্দ্রনাথ দত্ত থাকিতেন।

অভাব অনটনের সংসারে কীভাবে সংসারের খরচ,স্কুলের পাঠ্য বই,বেতন প্রভৃতির ব্যয় সঙ্কুলান হইবে তাহার জন্য নরেন্দ্রনাথ চিন্তিত হইতেন। এই বয়সেই তিনি অন্যের জমিনে নিড়ানি দিয়ে প্রথম আয় করা শিখেন।প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের সময় তিনি শ্রীকাইল বাজারে মুদির দোকানে কাজ করে যে মাইনে পেতেন তা দিয়ে শিক্ষা ব্যয়সহ সংসারের ব্যয় বহন করতেন।

এই বাল্য বয়সেই তিনি বিশ্বাস করিতে শিখিলেন যে ঐকান্তিক চেষ্টা ও উদ্যম থাকিলে আত্ম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।দেহ ও মনকে খাটাইতে কুন্ঠিত হইলেই বিপদ,কায়িক পরিশ্রমকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করাই মনুষ্যত্ব।তাঁহার সমগ্র ছাত্র জীবনে কঠোর কায়িক পরিশ্রম করিয়া অর্থোপার্জন করিয়াছেন এবং ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তিকে সুদৃঢ় আত্ম নির্ভরতার উপর গড়িয়া তুলিয়াছেন।

নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষায় স্কুল হইতে ২ টাকা বৃত্তি পাইয়া নিকটস্থ ‘ধনপতিখোলা ‘ স্কুলে ভর্তি হন। ১৩ বছর বয়সে প্রথম বিভাগে ছাত্রবৃত্তি পাশ করিয়া ১৮৯৯ সালে কুমিল্লা জিলা স্কুলে ৭ম শ্রেণিতে ভর্তি হন।এখানে নতুন করে অর্থোপার্জনের যুদ্ধ করতে হয়েছে।প্রথমে স্বল্প ব্যয়ের হোস্টেলে মাসে তিন টাকায় থাকা -খাওয়ার ব্যবস্থাপনায় থাকতে শুরু করেন।তিন/চার মাস অতিবাহিত হলে হোস্টেলের চার্জ দিতে না পারায় হোস্টেল প্রধান ক্যাপ্টেন নরেন্দ্রনাথ দত্তকে বের করে দেয়ে।

কাঁধে ব্যাগ নিয়ে উদ্দেশ্যহীন রাস্তায় নেমে পড়েন।কুমিল্লার এক মোক্তারের দয়ায় নিজ বাসায় লজিং থাকার ব্যবস্হা হয়।অবসরে কুমিল্লার নিকটবর্তী গ্রামাঞ্চল থেকে শাক -সব্জি তুলে শহরে বিক্রি করে স্কুল শিক্ষা ব্যয়, নিজের কাগজপত্র ও অন্যান্য খরচ মিটাতেন।

১৯০৬ সালে এন্ট্রাস পাস করিয়া ‘কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া ‘ কলেজে এফএ পড়তে আরম্ভ করেন।
১৯০৮ সালে এফএ পাস করে কোলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন।

এখানে নতুন করে আর্থিক যুদ্ধটা শুরু করেন তিনি।প্রথমে পার্টটাইম জব হিসেবে একটি কেমিক্যাল কোম্পানীতে জীবন শুরু।এরপর মাড়ওয়ারির দোকানে খাতা ও চিঠিপত্র লেখার কাজ করতেন।সর্বশেষ জাহাজের মালামাল উঠানো -নামানোর কুলির কাজ করে শিক্ষার ব্যয় বহন করতে।
১৯১৫ সালে এমবি ফাইনাল পরীক্ষায় অবতীর্ণ হণ এবং কৃতিত্বের সহিত পাস করেন।

১৯১৭ সালে পিতা পন্ডিত কৃষ্ণ কুমার দত্ত মৃত্যুবরণ করেন।
১৯১৯ সালে কোলকাতায় প্রতিষ্টিত বেঙ্গল ইমিউনিটি কোম্পানীর দায়িত্বভার তিনি গ্রহণ করেন।
১৯২৫ সালে সামরিক বাহিনীর ক্যাপ্টেন পদে পদোন্নতি না নিয়ে স্বেচ্ছায় অবসরে চলে আসেন।
১৯৩০ সালে সরকারের অন্যায় আইন অমান্য করে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সাথে প্রতিবাদ মিছিলে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৩৩ সালে Indian Research Institute Ltd প্রতিষ্ঠায় অর্থ প্রদানে উৎসাহ দেন। ১৯৩৪ সালে নবশক্তি পত্রিকা পুনঃ প্রকাশের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১৯৩৬ সালে শ্রীকাইল মাইনর স্কুলকে জুনিয়র হাই স্কুলে উন্নীত করেন।

১৯৩৯ সালে জুনিয়র স্কুলকে হাই স্কুলে উন্নীত করেন।
১৯৪০ সালে শ্রীকাইল হাই স্কুলকে বাজারের দক্ষিণ পাশ (বর্তমান স্টাফ কোয়ার্টার) থেকে কলেজের মূল ক্যাম্পাসে স্থানান্তর করেন।

১৯৪১ সালে শ্রীকাইল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৪৬ সালে বেঙ্গল ইমিউনিটি কোম্পানীতে কর্মচারি ধর্মঘট ধৈর্য ও দক্ষতার সহিত মোকাবেলা করেন।

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর পূর্ব বঙ্গ থেকে পশ্চিম বঙ্গে শরনার্থীদের দুরাবস্থার কথা বিবেচনা করে কোলকাতায় বাস্থ প্রতিষ্ঠান করে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সূচনা করেন।
দেশ বিভক্তির ফলে কোলকাতা থেকে আসা অধ্যাপকবৃন্দ কোলকাতায় ফিরে যান।ফলে শ্রীকাইল কলেজ বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর তিনি শ্রীকাইলে এসে ‘বাণী দেবি ট্রাস্ট ‘ গঠন করে পরিচালনা পর্ষদ এর উপর ন্যস্ত করেন।

১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর মাসে গ্রামের বাড়িতে এসে বিভিন্ন বিনোদন মূলক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে হৃষ্টচিত্তে শ্রীকাইল থেকে কোলকাতায় ফিরে যান।

১৯৪৯ সালের ৬ ই এপ্রিল নিজ বাস ভবনে হৃদরোগে আক্রান্ত হন।কোলকাতার ধর্মতলার নিজ বাস ভবনে হৃদরোগের চিকিৎসা চলাকালীন অবস্থাতেই দিবাগত রাত ৯-১৫ মিনিটে চির কুমার মনিষী ক্যাপ্টেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত মৃত্যু বরণ করেন।