ঢাকাMonday , 8 November 2021
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বিশ্বনাথে রবিউল হত্যা : ১৩ মাসেও প্রস্তুত হয়নি অভিযোগপত্র

Link Copied!

বিশ্বনাথ প্রতিনিধি : সিলেটের বিশ্বনাথে খুন করে লাশ বস্তায় ভরে গুম করে রেখে রাতের আধাঁরে সেই লাশ ডোবার পানিতে ভাসিয়ে দিয়ে নিজেরা আত্মগোপনে চলে যাওয়া এ যেন বাংলা সিনেমার কাহিনীর মতোই দৃশ্যমান ঘটনা।

১১ বছরের শিশু এক মাদ্রাসা ছাত্র রবিউল ইলামের সাথে। নিষ্ঠুর ঘাতকরা খুঁচিয়ে খোবলে-থেতলে ও ঘাড় মটকে সর্বশেষ ঘৃন্য হিংস্রতায় শ্বাসরোধ করে নিশংসভাবে কেড়ে নিয়েছিলো রবিউলের প্রাণ।

চরম নিষ্ঠুর হৃদয় বিদারক আলোচিত এ শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছিলো প্রায় ১৩ মাস পূর্বে।

সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার রহমান নগর ও করপাড়া গ্রাম সংলগ্ন গাঙ্গের পাড়ের আশপাশ এলাকায় ২০২০ সালের অক্টোবর মাসের ১২/১৩ তারিখের ভোর ৬ টার পূর্বে যেকোন সময়ে।

গত (২৪ অক্টোবর) ২০২১ রোববার সিলেটের আদালতপাড়ায় নিহত মাদ্রাসা ছাত্র শিশু রবিউল ইসলামের পিতা ও রবিউল হত্যা মামলার বাদি বিশ্বনাথ উপজেলার ৪নং রামপাশা ইউনিয়নের রহমান নগর গ্রামের বাসিন্দা দিনমজুর বর্গাচাষী মো: আকবর আলী (৪৫) অস্রশিক্ত নয়নে এ প্রতিবেদককে জানান যে, একটি গ্রাম্য সালিশে স্বাক্ষী দেওয়ার কারণে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে আমার ছেলেকে খুন করে লাশ গুম করে দেওয়া হয়েছিল।

ছেলে হারানোর শোকে কাতর আকবর আলী বলেন, করপাড়া গ্রামের সাদিকুল ও তার ফুফাতো ভাই নিয়ামত উল্লাহর নির্দেশেই কাদির, গোলাম হোসেন, হাসান, ফয়জুল ও মাজেদা গংরা মিলে রবিউলকে হত্যা করেছে।

পুলিশ প্রধান আসামীদের ধরতে পারেনি এবং মামলার চার্জশীট এখনো দিচ্ছেনা। এদিকে ময়না তদন্তের রিপোর্টও চলে এসেছে। কবে যে হবে আমার ছেলে হত্যার বিচার সেটা শুধু আল্লাহ তায়ালাই জানেন।

রবিউলের পিতার বরাত দিয়ে এ প্রতিবেদক জানান, গত বছর অক্টোবর মাসে ঘাড় মটকে দিয়ে অন্ডকোষ তেতলে পরে শ্বাসরোধ করে খুন করে শিশু রবিউলের লাশ গুম করে দেওয়া হয়েছিলো।

নিহতের পরিবারের দাবি, মূলত পূর্ব শত্রুতার কারনেই খুনিরা পরিকল্পিতভাবে রবিউলকে হত্যা করে। প্রায় দেড় বছর পূর্বে গুয়াহরি গ্রামের কামরান মিয়ার একটি গরু গাঙ্গগে পাড়ের সাদিকুলের জমির বীজ ধান নষ্ট করায় উত্তেজিত হয়ে সাদিকুল ওই গরুর পিছনের একটি পা কেটে দেন।

ঘটনাক্রমে নিহত রবিউল তখন সেখানে তাদের গরুকে ঘাস খাওয়াচ্ছিল এবং সে তা দেখে ফেলে। পরবর্তীতে স্থানীয় মেম্বার গুয়াহরি গ্রামের গোলাম হোসেনের বাড়িতে সাদিকুল কর্তৃক গরুর পা কাটা নিয়ে একটি গ্রাম্য বিচার সালিশ বসে এবং নিহত রবিউল সেখানে স্বাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হয়ে সাদিকুল কর্তৃক এমরান মিয়ার গরুর পা কাটার ঘটনা উপস্থিত বিচার সালিশে বর্ণনা করে।

রবিউলের স্বাক্ষীর প্রেক্ষিতে তখন সেই বিচারে সাদিকুলকে ভৎর্সনা করে শাস্তি দেওয়া হয় এবং ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় কিন্তু পরবর্তীতে এমরান মিয়া সেই টাকা নেননি।

মূলত এই স্বাক্ষী দেওয়াটাই কাল হয়েছিলো রবিউলের জীবনে। পরবর্তীতে সাদিকুল ক্ষিপ্ত হয়ে তার ফুফাতো ভাই গুয়াহরি গ্রামের নিয়ামত উল্লাহকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে রবিউল ও তার পরিবারকে হুমকি ধমকি প্রদান করে এবং এই অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ খোঁজতে থাকে।

গত (৬ অক্টোবর) ২০২০ সালে দুপুর অনুমান ১ টায় নিহত রবিউল ইসলাম আব্দুল কাদিরের বাড়ি সংলগ্ন তাদের বর্গা চাষকৃত ফসলি জমি দেখতে যায়।

ঘটনাক্রমে সাদিকুল সেখানে গিয়ে রবিউলকে তার জমির আইল দিয়ে যাওয়ার কারনে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এক পর্যায়ে রবিউলের গাল ও কানে চড় তাপ্পড় মেড়ে জমিতে ফেলে দিয়ে লাথি গুতা মেরে লীলা ফোলা জখম করে এবং এই নিয়ে সাদিকুলের উপর আবারও বিচার সালিশ বসে শাস্তি দেওয়া হয়।

এতে সাদিকুল ক্রোধে আক্রোশে ফেটে পড়ে এবং রবিউলের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ খোঁজতে থাকে। অবশেষে এসেও গেলো সেই সুযোগ, গত (১২ অক্টোবর) ২০২০ সালে বেলা অনুমান ১২ টায় নিত্য দিনের মতো রবিউল করপাড়া গ্রাম সংলগ্ন গাঙ্গের পাড়ে আব্দুল কাদিরের বাড়ির সামনে তাদের বর্গাচাষকৃত ফসলি জমি দেখতে ও কচুর লতি আনতে যায়।

কিন্তু নিষ্ঠুর ঘাতকের নিকৃষ্ট হিংসুতায় পরদিন ভোরে লাশ হয়ে ভাসে পার্শ্ববর্তী জমি সংলগ্ন বাল্লা ব্রিজের পাশের একটি ডোবায়।

উল্লেখ্য যে, রবিউল ইসলাম নিখোঁজ হওয়ার পর বিকেলে নিহত রবিউলের গ্রামসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মসজিদে মাইকিং করা হয়।

অবশেষে ঐ দিন রাত অনুমান ৮ টা ৩০ মিনিটের সময় রবিউলের মামা শওকত আলী বিশ্বনাথ থানায় একটি নিখোঁজ ডায়রী করেন।

যার জিডি নং- ৫৪৩, তারিখ: ১২/১০/২০২০ইং। আত্মীয়স্বজন ও সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজাখুজির পরে পরদিন ভোর অনুমান ৬টায় লোকমুখে শোনা যায় বাল্লা ব্রিজ সংলগ্ন সাজিুদর রহমানের ডোবায় একটি ভাসমান লাশ দেখা যাচ্ছে।

তৎক্ষনাত রবিউলের পিতা ও অন্যান্য লোকজন সেখানে উপস্থিত হয়ে রবিউলের লাশ শনাক্ত করে পুলিশে খবর দিলে বিশ্বনাথ থানার এসআই দেবাশীষ শর্মা সঙ্গীয় ফোর্সসহ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।

স্বাক্ষীদের সহায়তায় নিহতের রবিউলের মৃতদেহ ডোবা জমির পানি হইতে উঠাইয়া যখন সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করা হয় তখনও রবিউলের কান ও চোখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল, তাছাড়া মৃতদেহের চোখ, নাক ও কানের চামড়া ছিলানো ছিলো এবং পুরুষাঙ্গ ও অন্ডকোষ তেতলানো ছিলো।

কিন্তু সবচেয়ে উল্লেখ যোগ্য যে বিষয়টি এসআই দেবাশিষ শর্মা উল্লেখ করেন তা হলো ‘মৃতের ঘাড় মটকানো’ সুতরাং পুলিশ কৃর্তক প্রস্তুতকৃত সুরতহাল রিপোর্টে তাৎক্ষনিকভাবে প্রমানিত হয় যে, রবিউল ইসলামকে অত্যন্ত নিকৃষ্টভাবে বিকৃত মনমানষিকতায় হত্যা করে লাশ গুম করা হয়েছিলো।

ঐদিন অর্থাৎ ১৩ অক্টোবর ২০২০ইং বিকেল ৪.৩০ মিনিটে নিহত রবিউলের পিতা মো: আকবর আলী বাদী হয়ে করপাড়া গ্রামের সাদিকুর রহমান সাদিকুল, আব্দুল কাদির ও আব্দুল কাদিরের স্ত্রী মাজেদা বেগমসহ অজ্ঞাতনামা ৩/৪ জনকে আসামী করে ৩০২/২০১/৩৪ পেনাল কোড ১৮৬০ তৎসহ পুর্বপরিকল্পিতভাবে পরষ্পর যোগসাজশে হত্যা করা ও লাশ গুম করার অপরাধে বিশ্বনাথ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

মামলা নং-৯, তারিখ: ১৩/১০/২০২০ইং এবং ঐদিনই পুলিশ মাজেদা বেগমকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে ২ দিনের পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে আসলে মাজেদা বেগম ১নং আসামি সাদিকুলের অবস্থান সম্পর্কে পুলিশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করলেও অজ্ঞাত কারণে পুলিশ ঘাতক সাদিকুলকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়নি।

এদিকে পুলিশের গাফিলতির কথা উল্লেখ করে আলোচিত ও নৃশংশ হত্যার মূল আসামিদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে লতিফিয়া ইরশাদিয়া দাখিল মাদ্রাসা ছাত্র/শিক্ষকসহ এলাকাবাসী মিলে গত ১৬ অক্টোবর ২০২০ ইং তারিখে স্থানীয় বৈরাগী বাজারে বিশাল মানববন্ধন করেন।

কিন্তু তারপরও মূল আসামি গ্রেফতার না হওয়ায় একই দাবিতে গত ২১ অক্টোবর ২০২১ইং তারিখে বিশ্বনাথ উপজেলা সদরে আবারো মানববন্ধন করা হয়।

এরই প্রেক্ষিতে গত ২২ অক্টোবর ২০২০ইং তারিখে বিশ্বনাথ থানা পুলিশ অভিযান পরিচালনা করে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলাধীন বুরাইয়া গ্রামের মৃত আলকাব আলীর ছেলে জামাল হোসেন (৫০)কে গ্রেফতার করে।

কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো এলাকাবাসী ও এই মামলার বাদীর সূত্রমতে গ্রেফতারকৃত বৃদ্ধ জামাল হোসেন এই হত্যা সম্পর্কে কিছুই জানেন না।এরপর গত ০২ নভেম্বর ২০২০ইং তারিখে এলাকাবাসীর চাপে বাধ্য হয়ে বিশ্বনাথ থানা পুলিশ উক্ত মামলার বাদীর সন্দিন্ধ্য আসামী গুয়াহরি গ্রামের মৃত আজিজুর রহমানের পুত্র গোলাম হোসেনকে গ্রেফতার করে।

পুলিশের সূত্রমতে উক্ত আসামীর সাথে এই হত্যা মামলার পলাতক আসামীদের হত্যা করার পূর্বে এবং হত্যার পরে যোগাযোগের বিষয়ে যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। এদিকে লতিফিয়া ইরশাদিয়া দাখিল মাদ্রাসার ৩য় শ্রেণীর মেধাবী শিশু শিক্ষার্থী রবিউল ইসলামের হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গত ৯ নভেম্বর ২০২০ ইং ৪নং তারিখে রামপাশা ইউ/পির বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের স্বাক্ষরিতসহ এলাকার গণ্যমান্য প্রায় ১৫০ জনের নাম ও মোবাইল নাম্বার উল্লেখপূর্বক সিলেট বিভাগীয় কমিশনার বরাবরে একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

কিন্তু তারপরও এই আলোচিত এই হত্যার প্রধান আসামীদের পুলিশ গ্রেফতার করতে ব্যর্থ হয়।

নিহত রবিউলের পরিবার ও এলাকাবাসী পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সংশয়ে আছেন। দীর্ঘ ১৩ মাস পরেও তাদের একটাই দাবি প্রকৃত খুনিদের গ্রেফতার করে ফাসিতে ঝুঁলানো হোক।

আলোচিত এই হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে ধীরগতি ও প্রধান আসামীদের গ্রেফতারের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বনাথ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গাজী আতাউর রহমান প্রতিবেদককে জানান, মামলার তদন্ত চলছে এবং আসামীদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তদন্ত শেষ হলেই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

এদিকে নিরুপায় হয়ে পুত্র হত্যার বিচার চেয়ে নিহত রবিউলের পিতা দিনমজুর বর্গাচাষী আকবর আলী এই খবরের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশের আইজি ও সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আকুল আবেদন করে বলেন, উনার মৃত্যুর আগে যেনো উনি তার নিহত শিশু পুত্রের প্রকৃত খুনিদের বিচার দেখে যেতে পারেন।

পুত্র হারানোর শোকে কাতর আকবর আলী ও তার অসহায় হতদরিদ্র পরিবারের একটাই দাবি ‘মা জননী’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি আমাদের জন্য কিছু করেন। আমরা আজ বড় অসহায়।

সর্বশেষ আদালত থেকে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী জানা যায় যে, ৭ নভেম্বর ২০২১ইং তারিখে আলোচিত রবিউল হত্যা মামলার ১নং আসামী সাদিকুর রহমান সাদিকুল সিলেট সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্টেট আমলী আদালত-৩ এ উপস্থিত হয়ে জামিন প্রার্থনা করিলে আদালত জামিন না মঞ্জুর করে জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন।